Thursday, July 25, 2013

বইঃ বিপণন বিবর্তন। অধ্যায়-এক


অধ্যায় একঃ প্রারম্ভিক আলোচনা

১. সরাসরি বিক্রয় পদ্ধতি বা ডিরেক্ট সেলিং কি ?

২.  নেটওয়ার্ক মার্কেটিং কি ?

৩. বিপণন বিবর্তন ঃ ডিরেক্ট সেল্স থেকে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং

৪. নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতির জনপ্রিয়তার কারন।

## সরাসরি বিক্রয় পদ্ধতি বা ডিরেক্ট সেলিং কি ?

 সরাসরি বিক্রয় বা Direct Selling বলতে পণ্য ও সেবা সামগ্রী কোন নির্দিষ্ট মাধ্যম (যেমন এজেন্ট, পাইকারী বিক্রেতা ইত্যাদি) ব্যতীত একজনের (ক্রেতা) মাধ্যমে অন্যজনের প্রাক্তিকে বা উৎপাদন কারী হতে সরাসরি ক্রেতার প্রাক্তিকে বুঝায়। এ পদ্ধতিতে পণ্য বা সেবাসামগ্রী বাজার জাতকরনে অংশ নেয় ক্রেতা বা ভোক্তারা, যারা স্বাধীন ও সক্রিয় বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে এবং নির্দিষ্ট কমিশন লাভে সমর্থ হয়।

According to Direct Selling Association (DSA), “In Direct Selling, Product or services are marketed to customers by independent sales people person. to person Depending or the company, the sales people my be called distibutors, repre sentatie, comsuitants or various other tities. Products are sold primarily through in home product demornstration, parties and one on one selling.”

Direct Selling কোম্পানীগুলো প্রচলিত ধারার বিপণন পদ্ধতি বা গতানুগতিক বিপণন পদ্ধতির কোম্পানীগুলোর চেয়ে ভিন্নভাবে পণ্য সামগ্রী বাজারজাত করে, যেমন- গতানুগতিক বিপণন পদ্ধতিতে বিভিন্ন চ্যানেল ব্যবহার করে এজেন্ট ও ডিস্ট্রিবিউটরদের সহায়তায় পণ্য বিপণন করে থাকে। অন্যদিকে প্রতিনিধি বা ভোক্তার মাধ্যমে সরাসরি পণ্যও সেবা সামগ্রী বিক্রয় করে ডিরেক্ট সেলিং কোম্পানীগুলো।

ডিরেক্ট সেলিং কোম্পানী সাধারণত পণ্য সামগ্রী বিক্রয়ের জন্য প্রতিনিধি বা ডিস্ট্রিবিউটরদের (ক্রেতা বা ভোক্তা যারা কমিশন প্রাপ্তির লক্ষ্যে কাজ করে) কমিশন প্রদানের পাশাপাশি প্রতিনিধি কর্তৃক স্পন্সরকৃত ডাউন লাইন ডিস্ট্রিবিউটরদের উপর দীর্ঘ মেয়াদী কমিশন প্রদান করে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ডিস্ট্রিবিউররগণ নিজস্ব বিক্রয় বা পার্সোনাল ভলিউম ছাড়াও দলীয় বিক্রয় বা গ্রুপ ভলিউমের উপর কমিশন লাভে সক্ষম হয়। স্বাভাবিকভাবেই একজন ডিস্ট্রিবিউটর দীর্ঘমেয়াদে ধারনার চেয়েও অধিক উপার্জন করতে পারে।

সভ্যতার সূচনা হতেই আমরা ডিরেক্ট সেলিং এর সহিত জড়িত বর্তমানে এর পরিবর্তিত আধুনিকরূপ সবক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা লাভে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান এ পদ্ধতি অনুসরণ করছে। যেমন- এভন (Avon), ইলেকট্রোলাক্স, বাটারফ্লাই (Butterfly), এমওয়ে (Amway), ডিসকভারি টয়েজ (Discovery Toys)  আমাজন হাব, ন্যাশনাল (National Company) কোম্পানী, নিউ ভিশন ইন্টাঃ (New Vision Int:) ইত্যাদি। আমাদের দেশে কিছু ফার্মাসিকিউটিক্যাল কোম্পানী প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি বিপণন পদ্ধতি অনুসরণ করছে।

 ## নেটওয়ার্ক মার্কেটিং কি ?

 নেটওয়ার্ক মার্কেটিং এর উৎপত্তি মূলত সরাসরি বিপণন পদ্ধতি বা Direct Selling এর উপর ভিত্তি করে। ডিরেক্ট সেলিং এর নতুন বা পরিবর্তিত রূপই হল নেটওয়ার্ক মার্কেটিং। ডিরেক্ট সেলিং হলো প্রাথমিক পর্যায়ের সহজ পদ্ধতি যে পদ্ধতিতে পন্য ও সেবাসমূহ বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে মানুষ নির্দিষ্ট অবস্থান ছেড়ে বিভিন্ন অবস্থানে ঘুরে বেড়াত। অন্যদিকে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতিতে মানুষ একটি নির্দিষ্টস্থানে অবস্থান করে ক্রেতাদের নিজের দিকে উদ্ধুদ্ধ করে। অর্থাৎ কোম্পানীর পণ্য সামগ্রী, সেবা ও কমিশন সম্পর্কিত তথ্য একজনের মাধ্যমে অন্যজন পেয়ে থাকে। এবং এ পদ্ধতিতে প্রত্যেকে আয় উপার্জনের সুযোগ পেয়ে থাকে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতিতে বিক্রয় প্রতিনিধি বা পরিবেশকগণ ব্যবসায় নতুন ক্রেতাদের করতে পারে এবং স্পন্সর বা ডাউন লাইনে (ক্রেতা) বিক্রিত পণ্যের উপর কমিশন লাভ করতে সক্ষম হয়। এক্ষেত্রে সাধারণত স্বাধীন প্রতিনিধি বা ডিস্ট্রিবিউটরগন নিজেরাই প্রশিক্ষন, প্রেষণামূলক কার্যক্রম, দলীয় সহযোগিতা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিক্রয় বৃদ্ধি ও বিপণন কার্যক্রমকে গতিশীল করে।

নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতিতে জড়িত প্রতিনিধি বা পরিবেশক যারা নেটওয়ার্কার বলতে পরিচিত তারা প্রথমেই বেছে নেয় স্পন্সর হিসেবে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের। বিভিন্ন বয়স, পেশা ও শ্রেণীর মানুষ স্বতন্ত্র বিক্রয়কর্মী হিসেবে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং এ কাজ করার সুযোগ পায়। কোন প্রকার ব্যক্তিগত টার্গেট বা লক্ষ্য এবং কোন প্রকার বাধ্যবাধকতা থাকেনা বিধায় এ পদ্ধতিতে কোম্পানী ও সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে সু-সম্পর্ক গড়ে উঠে।

এ ধরনের বিপণন পদ্ধতিকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। যেমন- নেটওয়ার্ক মার্কেটিং (জালের ন্যায় বিস্তুৃতি করে বিধায়) মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (বিভিন্ন স্তর পর্যালোচনায় কমিশন প্রদান করে বিধায়), রিলেশনশীপ মার্কেটিং ইত্যাদি।

বর্তমানে আমরা শহরের আধুনিক শপিংমল ও চেইন ষ্টোরগুলোর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে দেখতে পাই নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা। যেমন- ডিসকাউন্ট, ফ্রি-অফার, গাড়ি পার্কিং ও বিনোদন ব্যবস্থা ইত্যাদি। এতদসত্ত্বেও ক্রেতারা সন্তুষ্ঠি লাভ করে না। এজন্য একই প্রতিষ্ঠানে দ্বিতীয়বার যাওয়ার তাগিদ অনুভব করেন। দীর্ঘ মেয়াদী কিংবা বাড়তি আয় প্রত্যেকের কাম্য যা শুধুমাত্র নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতিতে অনেকটা নিশ্চিত। ক্রেতা অধিকার সংরক্ষন ও পাশাপাশি বাড়তি আয়ের নিশ্চয়তা প্রদানের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতি যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন শুধু অপেক্ষার পালা, সেদিনের জন্য যেদিন প্রতিটি মানুষ নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতির সুফল ভোগ করবে।

## বিপণন বিবর্তন ডিরেক্ট সেল্স থেকে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং

ডিরেক্ট সেল্স পদ্ধতিতে উৎপাদনকারী নিজে বা লোক মারফত সরাসরি ভোক্তার নিকট পণ্য বিক্রয় করে। ডিরেক্ট সেলার বা সরাসরি বিক্রেতা হিসেবে যারা পরিচিত তাদের মধ্যে ফেরিওয়ালা, পরিভ্রমনকারী বিক্রেতা ও কাবুলিওয়াল৩দের (উপমহাদেশে) আনাগোনা দেখা যেত বেশি। সাধারণত এরা বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে পণ্য বিক্রয় করতো কেউ কেউ আবার দল বেঁধে গ্রামগঞ্জের হাট বাজারে পণ্য বিক্রয়ের জন্য পসরা সাজিয়ে বসতো।

ঐতিহাসিক বিনিময় প্রথার দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় একটি পণ্য প্রাপ্তির জন্য অন্য একটি পণ্য প্রদান করার বিধান ছিল যাকে ‘বারটার’ (Barter) বলা হতো। কৃষিজ পণ্যের সাথে গৃহস্থালীর প্রয়োজনীয় পণ্য, বস্ত্র ইত্যাদি বিনিময় করাই ছিল এ বারটার পদ্ধতির উদ্দেশ্য। মুদ্রা প্রথা চালুর পূর্ব পর্যন্ত এ পদ্ধতির প্রচলন ছিল।

সভ্যতার শুরুতে মিশর, সিরিয়া, ব্যবিলনীয়া ও ইন্ডিয়াতে ব্যবসায়িক প্রথা চালু ছিল। প্রাচীন গ্রীকের সাথে এশিয়ার এসব দেশের গৃহস্থালীর যন্ত্রপাতি, রান্নাঘর সামগ্রী, কাপড় ইত্যাদি আদান-প্রদান হতো। বর্তমান তুর্কী ( যা পূর্বে এন্তোনিয়া নামে পরিচিত ছিল) এলাকার লোকজন গাঁধার পিঠে চড়ে কাপড় বিক্রয় করে বেড়াতো।

পাঁচশত খ্রিষ্টাব্দের দিকে এথেন্সে সরাসরি বিপণনের ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। প্রস্তুতকারীরা কোন ধরনের মধ্যস্থকারবারীর সহযোগিতা ব্যতীত তাদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ক্রেতাদের নিকট বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন উৎসব ও মেলার আয়োজন করতো। খ্রিস্টাব্দে ১০০০ এর দিকে সমত্র বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সস্ত্র্ত্রসারন হতে শুরু করে, এর ফলে ডিরেক্ট সেলারদের বান্যিজিক কার্যক্রম প্রসার পেতে থাকে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের দরুন বিক্রেতাদের কায্যক্রম আরও সহজতর হতে থাকে। দূর দুরান্ত হতে পণ্য সামগ্রী গ্রামগঞ্জে বিস্তৃতি লাভ করতে শুরু করে। ফ্রান্সে, ডিরেক্ট সেলাররা বড় বড় শহরগুলো থেকে নতুন পণ্য সামগ্রী এনে  বাণিজ্য বৃদ্ধি করেছিল মফস্বলে ও গ্রামগঞ্জে পাশাপাশি ডিরেক্ট সেলারদের কাছ থেকে কেনা সুঁতি সিল্কের বেল্ট, মহিলাদের ওড়না, পিতলের দ্রব্যাদি, ইত্যাদির মাধ্যমে বড় বড় দোকানগুলো সজ্জিত হতো।

আমেরিকার বিখ্যাত ইয়াংকিরা ঘোড়ায় চড়ে সুঁই, পিন, কাঁচি, চিরুনী, পারফিউম জাতীয় পণ্য ফেরি করতো। পর্যায়ক্রমে তারা পশ্চিমাঞ্চল ও কানাডায় বিক্রয় কার্যক্রম চালাতে থাকে।  ব্যবসার সুবিধার্থে তারা পানিপথ ব্যবহার করতো বেশি। ইউরোপিয়ন যাযাবররা নতুন নতুন স্থানে সরাসরি পণ্য বিক্রয় করতো তাঁরা দল বেঁধে একস্থানে সাময়িক আবাস তৈরি করে এবং কাছাকাছি স্থানে পণ্য বিক্রয় শেষে পুনরায় নতুন স্থানে গিয়ে আবাস গড়তো। সাধারণত ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, জার্মানীসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশগুলোতে ইউরোপিয়ান যাযাবরদের বিচরণ ছিল বেশি বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেই ডিরেক্ট সেল্স এর ছোঁয়া লেগেছিল।*

বাজার প্রথা চালুর পূর্ব পর্যন্ত ডিরেক্ট সেল্স বা সরাসরি বিক্রয় পদ্ধতি ছিল সমগ্র বিশ্বব্যাপী পণ্য বিনিময়ের অন্যতম মাধ্যম এরপর বিপণনের বিবর্তন ঘটতে থাকে, বাজার পদ্ধতি চালূ হওয়ার সাথে সাথে মধ্যস্থ কারবারির সংখ্যা বাড়তে থাকে, ক্রেতা বা ভোক্তারা পূর্বের তুলনায় অধিক মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে অনেকটা বাধ্য হলো অর্থাৎ বাজারের নিয়ন্ত্রন পুঁজিবাদী ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যায়।

ঊনিশ শতকের শেষ ও বিংশ শতকের শুরুতে পুনরায় ডিরেক্ট সেল্স বা সরাসরি বিক্রয়ের আর্বিভাব হয়। এবং এ পদ্ধতির অনেকটা উন্নতি লক্ষ্য করা যায়। উৎপাদনকারীর কাছ থেকে লোকজন পণ্য ক্রয় করে তা বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশিদের কাছে স্বল্প লাভে বিক্রয়ের প্রচলন ঘটে। পরবর্তীতে হোম বেইজ বিক্রয় প্রথা চালু হয়।

ঊনিশশত চল্লিশের দিকে সরাসরি বিক্রয় প্রথার এক চমৎকার আর্বিভাব ঘটে।

আমেরিকার বিখ্যাত কেমিস্ট ডঃ কাল রেইন বোর্গ তার উৎপাদিত কৃত্রিম ভিটামিন (যা আয়োডিন ও ভিটামিন ‘ই’ এর  সংমিশ্রনে তৈরী) বাজারজাত করনের জন্য সর্বপ্রনম বহুমাত্রিক পদ্ধতি এর ধারনা প্রবর্তন করেন। পাশাপাশি ‘ক্যালিফোনিয়া ভিটামিন, নামে একটি কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করেন যা বিশ্বের প্রথম নেটওয়ার্ক মার্কেটিং কোম্পানী বলে ¯^xK…wZ পায়। কারন ১৯৪০ সালের শুরুতে এটিই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যার বিক্রয় কার্যক্রম ছিল বহুস্তরে বিভক্ত, যে ধারনা) হতে জন্ম নেয় বহুমাত্রিক বিপণন পদ্ধতি বা মাল্টিলেভেল মার্কেটিং পদ্ধতি। ডিরেক্ট সেল্স ও নেটওয়ার্ক মার্কেটিং এ দুটোর সূল পার্থক্য স্পন্সরিং অর্থাৎ ডাউন লাইন হতে প্রাপ্ত কমিশন। বর্তমানে মাল্টিলেভেল কিংবা সিঙ্গেল লেভেল সবক্টিই ডিরেক্ট সেল্স এর অর্ন্তভূক্ত।

১৯৫৯ সালে Nutilite Product Inc. (যার পূর্ব নাম ক্যালিফোনিয়া ভিটামিন, এর দুজন শীর্ষস্থানীয় ডিস্ট্রিবিউটর Amway Corporation নামে নতুন নেটৗয়ার্ক মার্কেটিং কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করেন। এমওয়ে কপোরেশন বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় একটি কোম্পানী। ১৯৫৮-৫৯ সালের দিকে আমেরিকান পার্লামেন্টে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতি আইনগত স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৭৫-৭৯ সনে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতির বৈধতার প্রশ্ন তোলে আমেরিকান সংস্থা FTC (Federal Trade Commission) নেটওয়ার্ক পদ্ধতির উপর নিষেধাক্তা আরোপ করে। এমওয়ে কপোরেশন এ নিষেধাক্তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়। FTC ও Amway Corp. এর এই মামলাকে Amway Safeguard বরে বিবেচনা  করা হয়। পরবতীতে এ মামলার রায়ে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতি বৈধতা লাভ করে। মূলত ভোক্তা বা ক্রেতার অধিকার সংরক্ষণ ও পিরামিড স্কীমের ব্যবহার বন্ধের উদ্দেশ্যে FTC এমন পদক্ষেপ গ্রহন করে।

বর্তমানে আমেরিকায় প্রায় দুইশত এর বেশি নেটওয়ার্ক মার্কেটিং কোম্পানী কার্যরত এর প্রতিটি কোম্পানীর শাখা বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। ২০০০ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী ৫৫ভাগ আমেরিকান নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতিতে পণ্য ক্রয় করে এবং ৫০ ভাগ মানুষ ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যভহার করে পণ্য ক্রয় করে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ১৯৬৩ সালে জাপানে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতি চালু হয়। বর্তমানে এশিয়াতে প্রায় সব কটি দেশে এ পদ্ধতি বিস্তার লাভ করছে। এমনকি চীনেও এ পদ্ধতির জনপ্রিয়তা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মালয়শিয়ার প্রতিটি মানুষ কোন কোন এম এল এম প্রতিষ্ঠানের সহিত জড়িত তারা ঘরে বসেই প্লান প্রদর্শন করে ও স্পন্সর তৈরী করে। আমাদের দেশে উদেক্তার অভাব ও সঠিক পদ্ধতি অনুসরনের অভাবে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে উঠছেনা। এ পদ্ধতির সম্ভাবনা বাংলাদেশে খুবই উজ্জ্বল।

বর্তমানে মোবাইল ও ইন্টারনেট প্রযুক্তি নেটওয়ার্ক মার্কেটিং আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। সমগ্র বিশ্বকে হাতের মুঠোয় এনে ব্যবসাকে করেছে গতিশীল ও সমৃদ্ধশালী। বিপণন পদ্ধতি নিত্য পরিবর্তিত হচ্ছে সংযোগ ঘটছে নতুন প্রযুক্তির বিপণনের এ বিবর্তন আগামী কাল হয়তো অন্য রূপ ধারন করবে। পুরোনো ধ্যান-ধারনা বা পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আমাদেরও দৌঁড়াতে হবে সময়ের সাথে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে।

 

## নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতির জনপ্রিয়তার কারন

এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী যতগুলো মার্কেটিং পদ্ধতি আবিষকৃত হয়েছে তম্মধ্যে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জনে সমর্থ হয়েছে। বিজ্ঞানের নতুন এক একটি আবিষ্কার যেমন মানুষকে চমকে দেয় তেমনি নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতির আবিষ্কার সমগ্র বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। যা শুধু মানুষের কল্যানে আর্শীবাদ হয়ে ধরা দিয়েছে। নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতির এমন কিছৃ বৈশিষ্ট্য বা গুনাবলী বিদ্যমান যা অন্যসব মার্কেটিং পদ্ধতির চেয়ে এটিকে অধিক জনপ্রিয় করে তোলেছে। নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতির কয়েকটি বিশেষ দিক আলোচনা করে এ জনপ্রিয়তার কারন অনুধাবন করতে পারব।

) ক্রেতার দৃষ্টিকোন থেকে

গতানুগতিক বা চলমান বিপণন পদ্ধতিতে আমরা সচরাচর দেখতে পাই একজন ক্রেতা নির্ধারিত মূল্য দিয়ে পণ্য ক্রয় করলে পণ্য ছাড়াও পণ্যভেদে বিক্রয়োত্তর সেবা লাভ করে কিংবা এমনও দেখা যায় একটি পণ্যের সাথে অন্য একটি পণ্য ফ্রি পাওয়া যায়। নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতিতে একজন ক্রেতা কি সুবিধা পেয়ে থাকেন তা দেখা যাক।

১। মূল্য অনুযায়ী পণ্য বা সেবা সামগ্রী

২। পণ্য ভেদে বিক্রয়োত্তর সেবা।

৩। পণ্যমূল্যের উপর বিশেষ ছাড় বা কমিশন।

৪। ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদী আয় করার সুযোগ।

৫। নতুন ক্রেতাদের অন্তভূক্ত করা এবং পার্টটাইম বা ফুলটাইম প্রদান করে ব্যবসা সমপ্রসারনের সুযোগ।

৬। উৎপাদনকারীকে সরাসরি পণ্যের সমস্যা অবহিত করা যায় এবং ক্রেতার অধিকার সংরক্ষিত হয়। নেটওয়ার্ক মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান হতে উপরোক্ত সব সুবিধা প্রাপ্তির পর কোন সন্দেহের অবকাশ থাকেনা যে এ পদ্ধতি জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছে বিশ্বব্যপী।

) বিক্রয়কর্মী বা বিপণন প্রতিনিধির দৃষ্টিকোন থেকে

বিক্রয়কর্মী বা বিপণন প্রতিনিধি বলতে আমরা বুঝি যারা কোম্পানীর পণ্য সামগ্রী বিক্রয়ে অংশ নেয়, কোম্পানী তথ্য প্রচার করে, বিপণন কার্য সম্পাদন করে চলমান বিপণন পদ্ধতিতে বিক্রয় কর্মীদের শ্রম ঘন্টা বেধে দেয়া থাকে এবং সেল্স টার্গেট পুরন করতে হয়। নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতিতে প্রত্যেক শ্রেণীর লোকজন বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতে স্বাছন্দ্যবোধ করে কারন বিক্রয়কর্মীরা এ পদ্ধতিতে তথ্য বিনিময় করে, স্বাধীনভাবে কাজ করে, নিজের কাজের সময় নিজে নির্ধারন করে নেয়, বিক্রয়কর্মীরা স্পন্সরিং এর মাধ্যমে ডাউন লাইন ডিস্ট্রিবিউটর বা বিক্রয়কর্মীদের পার্সোনাল ভলিউম বা গ্রুপ ভলিউমের উপর আকর্ষনীয় কমিশন লাভের সুযোগ পেয়ে থাকে এখন দেখা যাক কাজের সুযোগ কেমন- মধ্যমসারির একটি চলমান বিপণন পদ্ধতি অনুসরনকারী প্রতিষ্ঠানে যদি একশত বিক্রয়কর্মী বা প্রতিনিধি কাজ করার সুযোগ পায় তবে মধ্যমসারির একটি নেটওয়ার্ক মার্কেটিং প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পাবে লক্ষ্যাধিক বিক্রয়কর্মী বা ডিস্ট্রিবিউটর। ডিস্ট্রিবিউটরদের আয়ও পদোন্নতি সমাজে তাদের মর্যাদা আরো বাড়িয়ে দেয়। ফলস্বরুপ এ পদ্ধতি প্রত্যেকের নিকট জনপ্রিয়তা লাভ করে।

গ। লিডারদের দৃষ্টিকোন থেকে

নেটওয়ার্ক মার্কেটিং পদ্ধতিতে লিডার বা নেতা বলা হয় যারা ডিস্ট্রিবিউটর বা বিক্রয়কর্মী হিসেবে নিজের অবস্থানকে প্রথম সারিতে অধিষ্ঠিত করতে পেরেছে এবং ডাউন লাইনদের প্রেষনা প্রদান করে সফলতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। যে কোন মানুষ নিজের অবস্থানকে সমাজের ও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানে দেখতে ভালবাসে। একজন নেটওয়ার্ক মার্কেটিং লিডার গতানুগতিক পদ্ধতি অনুসরনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের চেয়ে দশগুন অধিক আয় করার সুযোগ পায় এবং সামাজিক প্রতিপত্তি ও মর্যাদা লাভের মাধ্যমে নিজকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। স্বাভাবিকভাবে উচ্চ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছে এর চেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি অন্য কোন্টি হতে পারে না।

কোম্পানীর দৃষ্টিকোন থেকে

যে কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য সর্বাধিক মুনাফা অর্জন এবং পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব পালন। একটি নেটওয়ার্ক মার্কেটিং কোম্পানী মুনাফা অর্জনে অন্য সব প্রতিষ্ঠানের চেয়ে এগিয়ে থাকে কারন এসব প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যাধিক ক্রেতা বা ডিস্ট্রিবিউটর বিক্রয়কর্মী ও সেলস লিডার থাকে যারা সার্বক্ষনিক পণ্যও সেবা সামগ্রী বিপণনে ব্যস্ত। মুনাফাজন ছাড়াও সামজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহন প্রেরণামূলক কর্মমুখী সম্পাদনে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং কোম্পানীগুলো এগিয়ে সর্বোপরি ব্যাপক কর্মসংস্থানে সৃষ্টি করে এসব প্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখতে সক্ষম হয়।

নেটওয়ার্ক মার্কেটিং কোম্পানীগুলো সাধারণ ক্রেতা বা প্রতিনিধিদের নিয়ে এগিয়ে যায়। যেখানে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তা একে অন্যের জন্য কাজ করে এবং অধিকার সংরক্ষন করে। এটা খুবই স্বাভাবিক যে ভোক্তা বা ক্রেতা ব্যতীত প্রতিষ্ঠান অনেকাংশে মূল্যহীন। প্রচলিত ধারার প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা বা লাভের জন্যই প্রতিযোগিতায় অবতীর্ন হয় আর নেটওয়ার্ক মার্কেটিং কোম্পানীগুলো ক্রেতাদের আয় বৃদ্ধি ও জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধির স্বার্থে করে। এ কারনে নেটওয়ার্ক মার্কেটিং বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার শীর্ষে।


No comments:

Post a Comment